ট্রেডিং ইমোশন
পরিচয়: আমি কে?
আমি কোনো প্রফেশনাল ট্রেডিং গুরুর দলে পড়ি না। আমি সেই সাধারণ মানুষটা—যে মোবাইল ফোনে চার্ট দেখে প্রথম ট্রেড নিয়েছিল। হাত কাঁপছিল, আর প্রফিট–লসের লাল–সবুজ রঙ দেখে নিজের আবেগ সামলাতে পারত না।
কখনো ৫০০ টাকা বা ১০০০ টাকা লাভ দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে প্রফিট বুক করে নিতাম। কিন্তু যখন লস হতো, ৫০০ টাকা লস দেখেও লস বুক করতাম না। মনে হতো—“হয়তো মার্কেট ঘুরে যাবে, লস কভার হয়ে যাবে, আমি লাভে বেরিয়ে আসব।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ৫০০ টাকা লস ১৫০০–২০০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়াত। একসময় পুরো ক্যাপিটালই শেষ হয়ে যেত।
এইভাবে অনেক দিন ট্রেড করেছি। ট্রেডিংয়ে ইমোশনকে আমি ভাঙতে পারিনি। আজ মনে হয়—এটাই সব রিটেইল ট্রেডারের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
আমি কোনো দিন বাজারকে হারানোর স্বপ্ন দেখিনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম—নিজের ভুলগুলো বুঝতে, আর ধীরে ধীরে একজন ডিসিপ্লিনড ট্রেডার হতে।
এই লেখাটা কোনো বইয়ের থিওরি নয়।
এটা একজন সাধারণ মানুষের ট্রেডিং মনের বাস্তব গল্প।
শুরুর গল্প
যেদিন প্রথম ট্রেড নিই, সেদিন আমার মাথায় একটাই কথা ঘুরছিল—
“আজ ট্রেডিং করে একটা বড় টাকা কামাব।”
কিন্তু ট্রেডে এন্ট্রি নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সামান্য লাভ দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে লোভ বেড়ে গেল। তারপরই শুরু হলো লস, আর মনে হতে লাগল-
“এই ট্রেডে যদি বড় লস হয়ে যায়?”
ট্রেড নেওয়ার আগেই ভয়।
ট্রেড চলাকালীন ঘাম।
আর ট্রেড শেষ হলে—অনুশোচনা।
সেদিন বুঝিনি-ট্রেডিংয়ে আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা চার্ট নয়,
আমার নিজের মন।
ট্রেডিং ইমোশন কী?
ট্রেডিং ইমোশন মানে হলো—ট্রেড নেওয়ার সময় বা ট্রেড চলাকালীন ভয়, লোভ, রাগ, আশা আর অহংকারের প্রভাব।
চার্ট একই রকম দেখায়,
কিন্তু দুইজন ট্রেডার দুইরকম সিদ্ধান্ত নেয়—
কারণ তাদের মানসিক অবস্থা আলাদা।
Fear (ভয়): যেখান থেকে সব শুরু
আমার প্রথম বড় সমস্যা ছিল ভয়।
আসলে ভয় না, ছিল বেশি টাকা রোজগার করার তীব্র ইচ্ছা। চাকরি করে পোষাত না—প্রতিদিন সকাল ৯টায় বের হওয়া, সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা, মাসের শেষে সামান্য ১০–২০ হাজার টাকা।
তাই ট্রেডিং শুরু করলাম।
কিন্তু যখনই ট্রেড নিতাম, সামান্য লাভ দেখলেই বেরিয়ে আসতাম।
৫০০ টাকা লাভ মানেই মনে হতো-
“এখনই বেরিয়ে যাও, না হলে সব উল্টে যাবে, পুরো টাকা হারিয়ে ফেলবে।”
পরে দেখতাম-স্টক ঠিক আমার টার্গেট পর্যন্ত গিয়েছে।
সেদিন রাতে নিজের ওপর ভীষণ রাগ হতো।
ধীরে ধীরে বুঝলাম—
-ভয় আমাকে লস দেয়নি,
- ভয় আমাকে বড় লাভ থেকে বঞ্চিত করেছে।
Greed (লোভ): লাভই শত্রু হয়ে দাঁড়াল
বারবার লস করার পর একটা জিনিস বুঝতে পারলাম-
লাভই একসময় আমার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কয়েকটা ট্রেড ভালো গেলে ভেতরের আরেকটা চরিত্র জেগে উঠত-লোভী সঞ্জিত।
টার্গেট হিট করেও ট্রেড ছাড়তাম না।
মনে হতো-
“আর একটু গেলেই তো ডাবল লাভ!”
স্টপলস সরিয়ে দিতাম।
ঠিক তখনই বাজার ঘুরে যেত।
তবুও এক ধরনের জেদ কাজ করত-
“যা হোক, মার্কেট উঠবেই।”
এই জেদ পিছু ছাড়ত না।
ফলাফল-একটা ভালো ট্রেড লোভের কারণে লসে শেষ হতো।
Hope (আশা): লস মেনে নিতে না পারার গল্প
লস চলাকালীন আমার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল আশা।
চার্ট স্পষ্ট বলছে-ট্রেড ভুল।
কিন্তু মন বলছে-
“হয়তো এখানে অপারেটররা ট্র্যাপ করছে।”
আসলে বুঝতেই পারতাম না-আমি নিজেই ট্র্যাপে পড়ে গেছি।
মনে হতো-
“একটু অপেক্ষা কর, মার্কেট ঘুরে যাবে।”
এই “একটু অপেক্ষা” অনেক সময় ছোট লসকে বড় ক্ষতিতে পরিণত করেছে।
সেই দিনগুলো আমাকে শিখিয়েছে-
আশা ট্রেডারকে বাঁচায় না,
ডিসিপ্লিন বাঁচায়।
Revenge Trading: সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়
একদিন একটার পর একটা লস হলো।
রাগে মাথা গরম।
মনে হলো-
“আজ সব উসুল করে নেব। আজ বাজারকে দেখিয়ে দেব।”
যেখানে ১ লটে অপশন ট্রেড করতাম, সেখানে হঠাৎ ২০ লট নিয়ে নিলাম।
কয়েক সেকেন্ডও লাগল না-ভয়ংকর লস।
কোনো প্ল্যান নেই।
পজিশন সাইজ বিশাল।
ফলাফল?
আরও বড় লস।
সেদিন বুঝেছিলাম-
রাগ নিয়ে নেওয়া ট্রেড মানেই নিশ্চিত ক্ষতি।
Overconfidence (অহংকার): জয়ের পর পতন
কিছু সময় প্রতিদিন ছোট ছোট ৫০০–১০০০ টাকা লাভ হতো।
মনে হতো-আমি মার্কেট বুঝে গেছি।
ভাবতাম-
“এইভাবেই ধীরে ধীরে বড় হব। আমি সব জানি।”
কিন্তু কয়েকদিন পরই পুরো অ্যাকাউন্ট উড়ে যেত।
- বাজার কাউকে শাস্তি দেয় না,
- বাজার শুধু অহংকার ভেঙে দেয়।
Turning Point: আমি কী বদলালাম?
একদিন ঠিক করলাম-আর না।
এবার নিজের মন নিয়ে কাজ করব।
আমি ৫টা জিনিস বদলালাম-
১. ট্রেডিং প্ল্যান ছাড়া ট্রেড নয়
এন্ট্রি, স্টপলস, টার্গেট-সব আগে ঠিক।
২. রিস্ক কমালাম
এক ট্রেডে ক্যাপিটালের ১–২% এর বেশি নয়।
৩. ট্রেডিং জার্নাল শুরু করলাম
প্রতিটা ট্রেডের সঙ্গে নিজের অনুভূতিও লিখতাম।
৪. সবদিন ট্রেড করা বন্ধ করলাম
অপর্চুনিটি না থাকলে-No Trade।
৫. নিজেকে প্রমাণ করার চাপ ছেড়ে দিলাম
নতুন পরিচয়: Disciplined Trader
আমি এখনো সব ট্রেডে লাভ করি না।
কিন্তু এখন-
লস আমাকে ভাঙে না
লাভ আমাকে অহংকারী বানায় না
নিয়মই আমার আসল শক্তি
-আমি বাজার জিততে চাই না,
-আমি নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ চাই।
শেষ কথা
ট্রেডিং মানে ভবিষ্যৎ বলা নয়।
ট্রেডিং মানে নিজেকে জানা।
আমি যখন নিজেকে ঠিক বুঝতাম না, তখনই লস করতাম।
এখন লাভ যতই হোক, লস খাওয়া বন্ধ হয়েছে।
যেদিন আপনি বুঝবেন-
আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু চার্ট নয়,
আপনি নিজেই,
সেদিন থেকেই আপনার ট্রেডিং বদলাতে শুরু করবে।
উপসংহার
ট্রেডিং ইমোশন কখনো পুরোপুরি দূর করা যায় না।
কিন্তু যদি আপনি-
ভয় চিনতে পারেন
লোভ থামাতে পারেন
লস মেনে নিতে পারেন
তাহলে আপনি ইতিমধ্যেই ৯০% ট্রেডারের থেকে এগিয়ে।
একটা কথাই মনে রাখবেন-
মার্কেট থেকে ট্রেনিং নেওয়ার পাশাপাশি
নিজের মনকেও ট্রেনিং দিন।
আজ বাজার নয়,
নিজের মনকে জয় করুন।
Disclaimer
এই লেখা শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। এটি কোনো ট্রেডিং পরামর্শ নয়। ট্রেডিংয়ে মূলধন হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
